জাহিদুর রহমান তারিক, ঝিনাইদহ:
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক ইউপি চেয়ারম্যান খুন হচ্ছেন। থামছে না স্থানীয় সরকারের রুট পর্যায়ের এই জনপ্রতিনিধিদের হত্যাকাণ্ড। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। সর্বশেষ মঙ্গলবার যশোরের সদর উপজেলার ইছালি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মোশাররফ হোসেন (৬০) কে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ খুনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭৪ জন ইউপি চেয়ারম্যানকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০১৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি ইউপির চেয়ারম্যান ও যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিল্লুর রহমান মিন্টু (৪৫) কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। কিন্তু আজও সেই খুনিরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একই ভাবে ৫ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ চেয়ারম্যান মোশাররফ হত্যার কোন কূলকিনারা করতে পারেননি। আটক হয়নি কোন খুনি।এ অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিদের দাবি, একের পর এক ইউপি চেয়ারম্যান খুন হলেও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় থামছে না হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বছরের পর বছর বিচারকাজ ঝুলে রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৮ই মে বাগেরহাটের ফকিরহাট সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ হাসান, মার্চ মাসে বেনাপোলের পুটখালী ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক, ১৬ই জুন ঝিনাইদহ সদরের নলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন বিশ্বাস, ২০১০ সালের ১৬ই আগস্ট ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বাদল, ২০০০ সালের ১৪ই জুলাই কুষ্টিয়ার জিকে ঘাটের কাছে হাটশহরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদ হোসেন সাচ্চু, ২০০৯ সালের ২৫শে জুলাই প্রকাশ্যে আলাউদ্দিন নগর রেল ব্রিজের নিচে কুমারখালীর কয়া ইউপি চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা জামিল হোসেন বাচ্চুকে খুন করা হয়।এছাড়া এ পর্যন্ত নিহত ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে রয়েছেন, যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি ইউপির চেয়ারম্যান আশরাফ হোসেন আশা, বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর ইউপির চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলী, নারিকেলবাড়িয়া ইউপির জামিল মাস্টার, রায়পুর ইউপির কাওছার আলী, বিদ্যানন্দকাঠীর আনছার মল্লিক, জামদিয়ার শেখ শফিউদ্দিন, যশোর সদরের বসুন্দিয়া ইউপির আবদুল মাজেদ শেখ, ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর ইউপির আবদুল জলিল ও নির্বাসখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা শওকত হোসেন, শার্শার পুটিয়াখালি ইউনিয়নের নূরুদ্দিন, বেনাপোল ইউপির আবদুল করিম, খুলনার তেরখাদার সাচিয়াদহ ইউপি চেয়ারম্যান চান মিয়া শিকদার, ডুমুরিয়া সদরের আবদুল মজিদ, কবিরুল ইসলাম, মাগুরখালির অতুল সাহা, ফুলতলার দামোদর ইউপির সরদার আবুল কাশেম, আটরার শেখ সিরাজুল ইসলাম, শেখ আবদুর রউফ, কয়লাঘাট ইউপির এন্তাজ আলি, ফুলবাড়ি ইউপির রুহুল আমিন, রূপসার নৈহাটি ইউপির গোলাম ফারুক, শ্রীফলতলা ইউপির আবুল হোসেন, বটিয়াঘাটার সুরখালি ইউপির মোস্তফা মো. হাবিব ও একই ইউপির চেয়ারম্যান শেখ জাহান আলী, দৌলতপুরের আবু গাজী, হাবিবুর রহমান, দিঘলিয়ার আব্দুল গফুর, ফুলবাড়ি ইউপির ইমরান গাজী, বটিয়াঘাটার ভাণ্ডারকোট ইউনিয়নের ইউসুফ মোল্যা ও আমীর আজম খান, পাইকগাছার দেলুটি ইউপির চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নাথ মণ্ডল, ফুলতলার দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বাদল, বাগেরহাটের মংলার বুড়িরডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান পার্থ প্রতীম পিন্টু, ডেমা ইউপির চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন তরফদার, কালুবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান, মোরেলগঞ্জের রামচাঁদপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ খাঁ ও তেলিগাতি ইউপি চেয়ারম্যান খান সাদেকুল ইসলাম সাদু খাঁ, ফকিরহাটের মানসা বাহিরদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আতর আলী এবং রামপালের বাইনতলী ইউপির চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ, আলী আকবর, খয়বর মণ্ডল, কয়া ইউপির চেয়ারম্যান আমু হোসেন, কুমারখালী ইউপির চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন, হাট হরিদাস ইউপির চেয়ারম্যান মাহমুদ হোসেন সাচ্চু, চুয়াডাঙ্গা জেলার কালিদাসপুর ইউপির চেয়ারম্যান মেহের আলী, আলমডাঙ্গার হেজালী ইউপির চেয়ারম্যান ইবনে সাঈদ কচি, জীবননগর আমদুল বাড়িয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বাকবুল ইসলাম বাবুল ও জামিল হোসেন বাচ্চু, নড়াইলের বিছালি ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও লোহাগড়ার মল্লিকপুর ইউপির চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, ঝিনাইদহের মহেশপুরের শ্যামপুর ইউপির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, মেহেরপুরের মহাজনপুর ইউপির চেয়ারম্যান বাহারুল ইসলাম মিলকি ও ফারুক হোসেন ভূঁইয়া, সাতক্ষীরার গহর আলী ও মিজানুর রহমান। বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যন ফোরাম যশোর জেলা শাখার সভাপতি ও যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যানরা গ্রাসরুট লেভেলে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশীদার।এ কারণে তাদেরকে নানা রকম রাজনৈতিক ঝক্কিঝামেলা সহ্য করতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ের চরমপন্থি সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের নলের মুখে থেকে চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণে চেয়ারম্যানরা প্রতি নিয়ত থ্রেটের মধ্যে থাকেন। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার কারণে প্রতি পদে পদে তাদের শত্রু তৈরি হয়। যার কারণে চুন থেকে পান খসলে তাদেরকে প্রাণ দিতে হচ্ছে, যার সর্বশেষ শিকার যশোরের ইছালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোশারফ হোসেন। আর প্রতিটি হত্যার পর ঘটনাগুলো বা এ সংক্রান্ত মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে বিচার বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নায়করা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কারণেই একের পর এক এই অঞ্চলের চেয়ারম্যানরা হত্যার শিকার হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, মূলত আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠত না হওয়া এবং দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নেয় সন্ত্রাসীরা। তার কারণে দিন দিন হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে। এভাবে একের পর হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকলে এক সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে কেউ আর নির্বাচন করতে চাইবে না। যার দীর্ঘ মেয়াদী ফল শুভ নয়। তিনি বলেন আমরা মোশাররফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চরমভাবে মর্মাহত। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এসব জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক।তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এলাকা ছাড়া। অনেকে জীবনের নিরাপত্তার অভাবে জেলা বা উপজেলা শহরে বাস করেন। অনেকে দিনের পর দিন পরিষদে বসতে পারছেন না। যার কারণে স্থানীয় সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্মের গতি মন্থর হচ্ছে । ব্যাহত হচ্ছে সরকারের উনয়নমূলক কর্মকাণ্ড। তিনি অবিলম্বে মোশারফ হোসেন, জিল্লুর রহমান মিন্টু, শওকত হোসেনসহ এই অঞ্চলের সব ইউপি চেয়ারম্যান হত্যার বিচার দাবি করেন।এদিকে নিহত ইউপি চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান মিন্টুর স্ত্রী সেলিনা পারভিন ও মোশারফ হোসেনের স্ত্রী ফেরদৌসি বেগম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দাবি করে খুনিদের শীঘ্রই আটক করা হবে। কিন্তু আস্তে আস্তে তা থেমে যায়। খুনিরা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যার কারণে দিন দিন তাদের মতো অনেককে অকালে বিধবার সাজ গ্রহণ করতে হচ্ছে। আর প্রতিটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে চলে রাজনীতি। তারা এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে তাদের স্বামীর খুনিদের আটকের দাবি জানান।
প্রকাশিত: ০৩/০৩/২০১৫ ১১:০২ অপরাহ্ণ
পাঠকের মতামত